Prof. Dr. Mostafa Kamal

ছোট ছোট কিছু নিয়মিত অভ্যাস আপনার হৃদয়কে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে পারে। জেনে নিন বিজ্ঞানসম্মত সহজ উপায়গুলো।

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের মধ্যে হৃদরোগ আজ অন্যতম প্রধান মৃত্যুর কারণ। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, এবং উদ্বেগজনক বিষয় হলো আক্রান্তদের একটি বড় অংশ তুলনামূলক কম বয়সী। অথচ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন আনলেই হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। হৃদরোগ মানেই হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে চলা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের ধীর ফল। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা, এবং এই প্রতিরোধ শুরু হয় প্রতিদিনের ছোট সিদ্ধান্ত থেকে।

আধুনিক জীবনযাত্রা আমাদের শরীরকে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় করে তুলেছে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ, ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্তি, ঘুমের অভাব এবং অব্যবস্থাপিত মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে হৃদযন্ত্রের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। ভালো খবর হলো, এই কারণগুলোর অধিকাংশই আমাদের নিয়ন্ত্রণে। নিচে এমন পাঁচটি অভ্যাসের কথা বলা হলো যেগুলো নিয়মিত মেনে চললে হৃদয় দীর্ঘদিন সুস্থ থাকবে।

১. প্রতিদিন কিছুটা হাঁটুন

দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং খারাপ কোলেস্টেরল কমায়। আপনি যদি একসঙ্গে ৩০ মিনিট সময় না পান, তাহলে দিনে তিনবার ১০ মিনিট করে হাঁটতে পারেন—উপকার প্রায় একই। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, কাছের দূরত্ব হেঁটে যাওয়া, কাজের ফাঁকে উঠে কিছুক্ষণ পায়চারি করা—এসব ছোট সিদ্ধান্তও দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য তৈরি করে। নিয়মিত হাঁটা ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে, যা হৃদরোগ প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

২. লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ করুন

অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদয়ের ওপর চাপ ফেলে। প্রতিদিন ৫ গ্রামের বেশি লবণ না খাওয়াই ভালো, আর কাঁচা লবণ একেবারেই পরিহার করা উচিত। ভাজাপোড়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিপস ও অতিরিক্ত তেলে রান্না করা খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলোতে লুকানো লবণ ও ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাট থাকে। বরং তাজা শাকসবজি, মৌসুমি ফল, আঁশযুক্ত খাবার এবং বাদাম ও মাছের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস বেছে নিন। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন সামুদ্রিক মাছ খেলে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়।

৩. ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করুন

ধূমপান রক্তনালির ভেতরের আবরণ নষ্ট করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়। এটি রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়ায়। গবেষণা বলছে, ধূমপান ছাড়ার এক বছরের মধ্যেই হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমে যায়, আর কয়েক বছরের মধ্যে তা প্রায় অধূমপায়ীর সমান হয়ে আসে। পরোক্ষ ধূমপানও সমান ক্ষতিকর, তাই ধূমপায়ীদের আশপাশে দীর্ঘ সময় থাকা থেকে বিরত থাকুন এবং ঘর ও কর্মস্থলকে ধোঁয়ামুক্ত রাখুন।

৪. পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও অপর্যাপ্ত ঘুম রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় এবং দেহে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রতিরাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা মানসম্পন্ন ঘুম নিশ্চিত করুন এবং ঘুমানোর আগে মোবাইল স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন। প্রতিদিন কয়েক মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, নামাজ-প্রার্থনা, ধ্যান বা পছন্দের কাজে সময় দেওয়া মনকে শান্ত রাখে এবং হৃদয়কে সুরক্ষা দেয়। কাজ ও বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দীর্ঘমেয়াদে হৃদয়ের জন্য বড় উপকার বয়ে আনে।

৫. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান

৩৫ বছরের পর থেকে নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা জরুরি। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ থাকে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তা হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে থাকে। তাই পারিবারিক ইতিহাসে হৃদরোগ থাকলে আরও আগে থেকেই সতর্ক হওয়া দরকার। নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়লে সহজ ব্যবস্থাপনাতেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়।

বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ ঘাম, বাঁ হাতে বা চোয়ালে ব্যথা—এসব উপসর্গকে কখনো অবহেলা করবেন না। এগুলো হৃদরোগের জরুরি সংকেত হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানো সম্ভব। মনে রাখবেন, সুস্থ হৃদয় গড়ে ওঠে প্রতিদিনের সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে। আজ থেকেই একটি ভালো অভ্যাস শুরু করুন এবং একটি ক্ষতিকর অভ্যাস বাদ দিন—আপনার হৃদয় সারাজীবন এর প্রতিদান দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WhatsApp Call / Phone